শুরু করবেন? গবেষণা শুরুর পূর্ব প্রস্তুতি কি কি?
“Happiness
does not come from doing easy work but from the afterglow of satisfaction that
comes after the achievement of a difficult task that demanded our best.”
-Theodore
Isaac Rubin
কেন গবেষণা?
ব্যক্তি জীবনে আমাদের গবেষণা শেখার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি।
কিন্তু আমরা যারা গবেষণা শিখি তাদের এর বাইরেও বেশ কিছু উদ্দ্যেশ্য থাকে। যেমন উচ্চ
শিক্ষায় নিজেকে কিছুটা এগিয়ে রাখা, নিজের চিন্তা শক্তিকে শাণিত করা, গবেষক গবেষক একটা
ভাব নিয়ে আসা বা নিজের সিভিটাকে একটু সুন্দর করা। সেকেন্ডারি বা গৌণ উদ্দেশ্য যেটাই
থাকুক না কেন আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য যেন হয় জ্ঞান অর্জন। হিসাবটা খুব সহজ, গবেষণার
মূল উদ্দেশ্য যদি হয় জ্ঞান অর্জন তাহলে গবেষণায় আপনার আগ্রহের কখনো কমতি হবে না। আর
পাশাপাশি আপনার সেকেন্ডারি বা গৌণ উদ্দেশ্য গুলোও সাধিত হবে। সুতরাং গবেষণার উদ্দেশ্য
হোক জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞানের সৃষ্টি। তাহলেই কেবলমাত্র আপনি গবেষণার সত্যিকারের স্বাদ
নিতে পারবেন।
উদ্দেশ্য যেটাই হোক, শুরুটা করবেন কখন?
গবেষণা খুব মৌলিক একটা ব্যাপার। সাধারনত আমরা চাইলেই যে কোন স্টেজে গবেষণা
শুরু করতে পারিনা। কারন কোন একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণা শুরুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট
বিষয়ের বাইরেও বেশ কিছু বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা। যেমন আপনি যদি অর্থনীতির ছাত্র হয়ে থাকে
আর আপনি যদি ফুড সিকিউরিটি, দারিদ্রতা, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে
থাকেন তাহলে আপনাকে আনুষঙ্গিক বেশ কিছু বিষয়ে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন হবে কিভাবে
বিভিন্ন ভ্যারিয়েবল বা একটা বিষয় অন্য বিষয়ের সাথে কিভাবে সংযুক্ত সে সম্পর্কিত জ্ঞান।
সেই হিসাবে গবেষণা শুরুর সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে স্নাতক পর্যায়ের তৃতীয় বর্ষ থেকে। কারন
তত দিনে আপনি আপনার পড়াশোনার বিষয়ে জ্ঞানের দিক থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে যাবে। কোন সুনির্দিষ্ট
বিষয়ে আপনার গবেষণা করা উচিৎ সেটা ভাববার মত জ্ঞান ততদিনে আপনি অর্জন করবেন। তবে হ্যাঁ
স্নাতক প্রথম বর্ষে বা এর আগেও যে আপনি গবেষণা শুরু করতে পারবেন না সেটা কিন্তু না।
একজন ইন্ডিপেনডেন্ট গবেষক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এ সময় বেগ পেতে হতে পারে। তাই এই সময়ে
সরাসরি গবেষণায় যুক্ত না হয়ে গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় যেমন ডেটা কালেকশন,
কিছু সফটওয়্যার স্কিল, ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়ানো ইত্যাদিতে মনোযোগ দিতে পারেন। পাশাপাশি
আপনি যদি স্নাতক প্রথম বর্ষেই সম্পুর্ন মনোযোগ গবেষণায় দিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে একাডেমিক
রেজাল্টে কিছুটা খারাপ প্রভাব পড়তে পারেন। সুতরাং এই সব বিষয় বিবেচনা করেই আপনাকে সিদ্ধান্ত
নিতে হবে যে আপনি আসলে ঠিক কখন সরাসরি যুক্ত হতে চান।
শুরুর আগের প্রস্তুতিটা?
গবেষণা হচ্ছে একটা রীতিবদ্ধ প্রক্রিয়া।
অর্থাৎ অন্য সব কাজের মত করে শুধু করে গেলেই হয়না। প্রয়োজন একটা সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার।
এবং এই কাজটা আপনি সম্ভবত ইউটিউব বা কয়েকটা আর্টিকেল পড়েই শিখতে ফেলতে পারবেন না। হ্যাঁ
একদমই পারবেন না সেটা কিন্তু না। আপনি পারবেন ঠিকই। কিন্তু জ্ঞান যে গুরু কেন্দ্রিক
সে বিষয়টা গবেষণা শুরু করতে গেলেই হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারবেন।
আর এ কারনে আপনার প্রয়োজন হবে কারো
গাইডলাইন। পাশাপাশি কিছু সফটওয়্যার স্কিল যেমন মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এবং এক্সেল সম্পর্কে
অন্তত পক্ষে মাঝারি লেভেলের ধারনা। সেই সাথে ইংরেজিতে একটু দক্ষতা, গুগল করার অভ্যাস,
পরিসংখ্যান সম্পর্কে কিছুটা ধারনা। আপনি যদি আসলেই গবেষণা শিখতে আগ্রহী হয়ে থাকেন তাহলে
আজকে থেকে এই খুঁটিনাটি বিষয় গুলো সম্পর্কে গুরুত্ব দিন। পাশাপাশি একজন ভালো মেন্টর
খুঁজে বের করার চেস্টা করেন। একজন ভালো মেন্টরের সহযোগিতা আপনার গবেষণা শেখার যাত্রাপথে
শতগুন দ্রুত এগিয়ে দিবে।
এর পর?
এর পরের ধাপ হলো আপনার মেন্টর খুজে বের করা। এই ধাপটাই হচ্ছে সবচেয়ে জটিল।
আপনার সিজিপিএ একটু কম থাকলেই ডিপার্টমেন্ট এর শিক্ষক বা বড় আর আপনাকে সহজে এলাউ করবে
না। কারন কেউই চাইবেনা একটা গাধা পিটিয়ে মানুষ করুক। আর হাতের কাছে যদি ভালো ছাত্রের
আনাগোনা থেকে থাকে তাহলে আমার আপনার মত কম সিজিপিধারী ছেলে মেয়েদের কিন্তু কেউ কাছে
ঘেঁষতে দিবে না।
তাহলে করনীয় কি?
লেগে থাকুন। শিক্ষকদের বিষয়ে পরে আসি। বড় ভাই যিনি গবেষণা করেন বা করছেন
তার পিছে পড়ে থাকেন। ভাইয়ের হাত পা টিপে দেন প্রয়োজনে। পারলে ডাইনিং থেকে দুপুরের ভাইয়ের
খাবারটা এনে দেন, অথবা বাসার থেকে নিজের জন্য রান্না করে পাঠানো খাবার ভাইয়ের জন্য
পাঠিয়েছে বলে চালিয়ে দেন। পারলে নিজের কলিজা ভুনা করে খাওয়ান। আপনার আসল উদ্দেশ্য গবেষণা
শেখা। নিজেকে ভাইয়ের খাস বান্দা হিসাবে প্রমাণ করা। শিখে নেয়ার আগ পর্যন্ত আপনাকে এরকম
অনেক কিছুই করতে হবে। ভাই যদি একবার বুঝে ফেলে যে আপনি তার খাস বান্দা তাহলে অর্ধেক
কাজ এখানেই শেষ। ভাইয়ের সান্নিধ্যে থেকেই আপনি গবেষণা শিখে নিতে পারবেন।
কিন্তু শিক্ষক?
টিচারদের চেম্বারে একসেস পাওয়াটা কিন্তু এত সহজ না। বড় ভাইদের রুমে দুই
দিন ঘুরলে বা ভাইয়ের একটু প্রশংসা করলেই হাতে চলে আসে। কিন্তু শিক্ষক?
এখানের স্ট্রাটেজি একটু ভিন্ন ধরনের হতে হবে। প্রথমেই এমন একজন শিক্ষককে
টার্গেট করুন যিনি আসলেই শেখাতে ইচ্ছুক। সেক্ষেত্রে প্রোফেসর লেভেলে না গিয়ে একটু নিচের
দিকে খোঁজ রাখেন। ক্লাসে প্রশ্ন করা। মাঝে মাঝে গবেষণা বিষয়ে আলাপ করা চেম্বারে গিয়ে।
ঐ স্যারের সাবজেক্ট এ একটু অতিরিক্ত মনযোগ দেয়া। আপনি কোন কোর্সে এনরোল
করে সেটা জানানো, ইত্যাদি। অর্থাৎ একটু সময় নিয়ে তাকে বোঝানো যে আপনি গবেষণা শিখতে
ইচ্ছুক। সবচেয়ে ভালো হয় আপনি যদি যে কোন ভাবে গবেষণার কোন একটা কাজ একটু এগিয়ে রাখতে
পারেন। কতটা ভালো করলেন তার থেকেও গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে আপনার আগ্রহ। আপনার শিক্ষক আপনার
আগ্রহ দেখবেন, এর বেশি কিছুনা। তবে হ্যাঁ প্রোফেসর লেভেলের কাউকে নিজের আয়েত্ত্বে নিয়ে
আসতে পারলে তো কথাই নেই। তাদের জ্ঞান সমুদ্র থেকে একটা ফোটা জল পেলেও আপনি উদ্ধার।
তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন যে শিক্ষকদের কাছে একবার গিয়ে যদি ফাঁকিবাজি
শুরু করেন তাহলে পরবর্তিতে সুযোগ পাবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই স্যারদের চেম্বারে একসেস
নেবার আগে আপনাকে শিওর হতে হবে যে স্যারের প্যারা নেবার মত মানসিক ইচ্ছা এবং ধৈর্য
আপনার আছে কিনা।
শিক্ষক বা ভাই কেউই নেই?
অনেকেরই এই সমস্যার সম্মুখিন হয়ে থাকেন। বা এমন অনেকেই আছেন যাদের সিজিপিএর
অবস্থা এতটাই নাজুক যে মাঝে মাঝে নিজের কাছে নিজেরই মনে হয় তুই ব্যাটা কিসের গবেষণা
করবি? আগে পাশটা করতে পারিস কিনা দেখ।
তাই বলে তো গবেষণা শেখার ইচ্ছাটা তো আর মারা যাবে না তাইনা?
বর্তমান সময়ে অনলাইন ভিত্তিক অনেক গ্রুপ বা পেইজ আছে যারা পেইড বা আনপেইড
ভাবে গবেষণা শিখিয়ে থাকে। পাশাপাশি নিজে প্রচুর পড়াশোনা করতে থাকুন গবেষণা নিয়ে। দেখবেন
একটু সময় প্রয়োজন হলেও আপনি ঠিকই গবেষণা শিখে ফেলবেন। গবেষণায় যুক্ত হলে সবচেয়ে দারুন
যে বিষয়টা ঘটবে সেটা হলো আপনার জ্ঞানের গভীরতা বাড়বে। লেগে থাকলে কিছু দিন পরেই নিজের
পরিবর্তন নিজেরই চোখে পড়বে।
টাকা পয়সা নেই, ডেটা পাবো কোথায়?
নতুন গবেষকদের অন্যতম একটা সমস্যা হলো গবেষণার জন্য ডেটা না পাওয়া। যেহেতু
ডেটা সংগ্রহের সাথে সময় ও অর্থ জড়িত সেহেতু অনেকেই এই সমস্যার সম্মুখিন হয়ে থাকেন।
সেক্ষেত্রে আপনারা আপনাদের সিনিয়রদের কাছে থেকে অব্যবহারিত ডেটা নিতে পারেন। বেশিরভাগ
ক্ষেত্রে যারা গবেষণা করে থাকেন তাদের কাছে প্রচুর অব্যবহারিত ডেটা থাকে। সম্পর্ক ভালো
থাকলে আপনি সহজেই এই সব ডেটার একসেস পেতে পারেন।
সেটা সম্ভব না হলে লার্নিং স্টেজে এমন একটা বিষয় নির্বাচন করুন যেন আপনি
খুব সহজেই ডেটা সংগ্রহ করতে পারেন। এমন হতে পারে আপনার হলের ফুড সিকিউরিটি, মেয়েদের
হেলথ হাইজেন, ক্যাম্পাসের ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, সিজিপিএ কেন বাড়ে কমে, ইত্যাদি। তাছাড়া
ক্যাম্পাসের আশেপাশে যারা থাকেন তাদের থেকে ডেটা নেয়া যাবে সেরকম কিছু বিষয় নিয়ে প্রথম
দিকে গবেষণা শুরু করতে পারেন।
অপ্রিয় সত্য
গবেষণা বিষয়টা একটু প্রেস্টিজিয়াস। সুতরাং আপনাকে একটু কষ্ট করতেই হবে।
যদি ভেবে বসে থাকেন কোন ভাবে এদিক সেদিক করে দুই একটা পেপার পাবলিস করে গবেষকের খাতায়
নাম লেখাবেন তাহলে সেটা বড় ধরনের ভুল হবে। দুই একটা পেপার হয়ত আপনার পাবলিস হবে কিন্তু
গবেষণার আসল ফ্লেভার আপনি পাবেন না।
গবেষণা শেখাটা হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ধীরে ধীরে আপনি শিখবেন। সময়
নিয়ে শিখবেন। অন্তত পক্ষে একটা বছর টানা লেগে থাকলে আপনি খুব প্রাইমারি লেভেলের ধারনা
পাবেন। কিছুটা বুঝতে পারবেন গবেষণার প্রসেস সম্পর্কে।
আপনাকে মাথা ঠান্ডা রেখে লেগে থাকা শিখতে হবে আগেই। শুরুর দিকে কোন কুল
কিনারা খুজে পাবেন না। মনে হবে এত দিন স্যার ম্যামদের সাথে লেগে আছি কিন্তু কিছুইতো
শিখতে পারলাম না। এরকম মনে হলো মানেই আপনি সঠিক রাস্তায় আছেন। আর দুই এক মাসের মধ্যে
যদি সব শিখে যান তাহলে ধরে নিবেন আপনি আসলেই কিছু শিখেন নাই। অনেক ক্ষেত্রে দির্ঘ সময়
শিক্ষকদের সাথে কাজ করার পরেও দেখা যাবে আপনি কোন পেপারের অথর হিসাবে নেই। এই ক্ষেত্রে
হতাশ হবেন না। আপনি যদি পেপারে ফোকাস করেন তাহলেই আপনারই ক্ষতি। আপনার টার্গেট থাকতে
হবে মাছ ধরা শিখে নেয়া। কারন মাছ ধরার কৌশন শিখে নিতে পারলে আপনাকে আর অন্যের জন্য
অপেক্ষা করতে হবে না।
আবার অনেক সময় কেউ হয়ত সেইভাবে আপনাকে সহযোগিতা করবে না। দেখবেন এইটা পারেন
তো ঐটা পারেন না, এইটা সহজ তো ঐটা কঠিন। এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়। যখন যেটা প্রয়োজন
হবে তখন যেটা নিজ থেকে শিখে নিবেন। তাড়াহুড়া করে সব কিছু একবারে শিখতে গেলেন তো ধরে
নিতে পারেন আপনাকে দিয়ে আর যেটাই হোক গবেষণা হবে না।
আর একবার যদি শিখে নিতে পারেন তাহলে আপনাকে হয়ত আর পিছন ফিরে তাকাতে হবেনা।
তবে হ্যাঁ, যখন অন্যের সাথে গবেষণায় যুক্ত হবেন তখন একটা বিষয়ে খুব তীক্ষ্ণ ভাবে খেয়াল রাখবেন। সেটা হলো আপনার মেন্টর আপনাকে শেখাচ্ছে কিনা। যদি এমন হয় আপনাকে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজ গুলোই শুধু করাচ্ছে কিন্তু গবেষণার মুল বিষয়গুলো শেখাচ্ছে না তাহলে আপনাকে ভিন্ন পথে এগোতে হবে। কারন আপনি দীর্ঘ সময় লেগে থেকে যদি গবেষণাপত্র লেখার নিয়মগুলো শিখতে না পারেন তাহলে আপনার পরিশ্রম বৃথা হবে। সুতরাং এই বিষয়ে আপনাকে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

Comments
Post a Comment