কেন বিশ্বব্যাপী একটি মাত্র মুদ্রা প্রচলন সম্ভব নয়?

 


কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন সারা পৃথিবীতে একটা মাত্র মুদ্রা বা কারেন্সিতে লেনদেন হয়না? একটা সাধারন মুদ্রায় সব লেনদেন হলে তো ভালোই হতো। মুদ্রার মান বাড়া বা কমার কোন ঝামেলা থাকতো না। থাকতো না মুদ্রাস্ফীতির মত বিষয়ের জটিল সব কাহিনী। তাহলে কেনই বা সমগ্র বিশ্বে একটা মাত্র মুদ্রার প্রচলন নেই?
বস্তুত, একটামাত্র মুদ্রা ব্যবহারের যেমন দারুন দারুন সব পজেটিভ দিক আছে তেমনি আছে বেশ কিছু নেগেটিভ দিকও। যার কারনে চাইলেও বিশ্ব ব্যাপি একটা মাত্র মুদ্রার প্রচলন সম্ভব হয় না। 

বিশ্বব্যাপী একটা মাত্র মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থা থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আমদানি রপ্তানি জটিলতা কমে যাওয়া। গত কিছুদিনের পত্রপত্রিকায় চোখ রাখলে দেখবেন আমাদের আমদানিকারক সংস্থাগুলো ইদানীং আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। তার অন্যতম একটি কারন হলো আমাদের বর্তমান কারেন্সির (টাকা) মূল্যমান হ্রাস পাওয়া। ধরেন বর্তমান (উচ্চ) মূল্যে কোন ব্যবসায়ী যদি বিদেশ থেকে  কিছু পণ্য আমদানি করে থাকে এবং কিছুদিন পরেই যদি সেই পণ্যের মূল্য বিশ্ববাজারে কমে যায় তাহলে আমদানিকারকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। কিন্তু আমাদের দেশে সব কিছুই যদি ডলারে কেনাবেচা হতো বা আমাদের মুদ্রাও ডলার হতো তাহলে এই ক্ষতির পরিমানটা অনেকাংশেই কমে যেত৷ তাহলে বুঝতেই পারছেন একটা মাত্র কারেন্সি বা মুদ্রা ব্যবস্থার উপকারিতা কেমন। তাছাড়া ভিন্ন ভিন্ন দেশের মুদ্রা আদান প্রদানের ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু অর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। যেমন আপনি দেখবেন যে ডলারের ক্রয়মূল্য এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকে যেটা কিনা ভোক্তাকে বহন করতে হয়। অথচ আমাদের দেশেও যদি ডলারে প্রচলন থাকতো তাহলে কিন্তু এই অর্থনৈতিক ক্ষতিটা এড়িয়ে চলা সম্ভব ছিলো। পাশাপাশি একটা কমন কারেন্সি বা মুদ্রা বিদ্যমান থাকলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলোও অনেক বেশি টেকসই হতো এই কারনে যে তখন উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পন্য বা সেবার মূল্যের খুব বেশি উঠানামা হতো না। আর আমাদের মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয়ও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেত না। 
কিন্তু এত সব সুবিধার মধ্যেই বেশিকিছু অসুবিধা থেকে যায় যেগুলো কিনা সুবিধাগুলোকে পাশে ঠেলে দেয়। 

ধরুন বাংলাদেশ এবং নেপাল চিন্তা করলো দুই দেশই এখন একই মুদ্রায় (টাকায়) লেনদেন করবে। এখন পলিসি লেভেলে যারা আছেন তারা দুই দেশের উৎপাদিত পণ্যের (যেমন ধরি দুই দেশেই ১০০ কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়) উপর ভিত্তি করে দুই দেশের ১০০ করে মোট ২০০ টি নোট প্রিন্ট করার সিদ্ধান্ত নিলো। এতে করে দারুন একটা ঘটনা ঘটবে এবং সেটা হলো আপনি নিশ্চিন্তে বাংলাদেশ বা নেপালে ১০০ টাকা দিয়ে ১ কেজি পেয়াজ কিনতে পারবেন। কিন্তু বিপত্তি তৈরি হবে অন্য জায়গায়। মনে করেন এই বছর বন্যার কারনে নেপালে পেয়াজের উৎপাদন কমে গিয়ে ২০ কেজিতে নেমে আসলো। সেক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যের উপর ভিত্তি করে নেপাল চাইলেই তাদের মুদ্রিত নোটের সংখ্যা কমাতে পারবেনা কারন কত গুলো নোট মুদ্রিত হবে সেটা নির্ধারণ করবে  পলিসি লেভেলে যারা আছে তারা। এখানে তখন প্রতিটা দেশের হাতে মুদ্রা প্রনয়নের ক্ষমতা থাকবে না। এইক্ষেত্রে নেপালে পেঁয়াজের উৎপাদন কমে যাওয়া  চাহিদা যোগানের (Demand supply law) নীতি অনুসারে নেপালের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। অর্থাৎ এখন আপনি চাইলেই ১০০ টাকা দিয়ে এক কেজি পিয়াজ কিনতে পারবেন না। এক কেজি পেঁয়াজের জন্য আপনাকে আরো বেশি ব্যয় করতে হবে নেপালে এবং এই মুল্য বৃদ্ধির সমস্যাটা বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করবে এবং বাংলাদেশের মানুষকে নেপালের কম উৎপাদনের জন্য বেশি দামে কিনতে হবে পেয়াজ। কারণ, একই কারেন্সি থাকাতে নেপালের ভোক্তারা বাংলাদেশের পন্য কিনবে এবং একটা চাহিদা যোগানের গ্যাপ তৈরির মাধ্যেমে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হবে অন্য একটি দেশ যেখানে কিনা পর্যাপ্ত পরিমান পন্য উৎপাদিত হয়েছিলো। 

এবার অন্য ভাবে চিন্তা করি। একটা দেশের FDI বা বৈদেশিক বিনিয়োগ নির্ভর করে থাকে ঐ দেশের পন্য বা সেবার মুল্যের উপর। সাধারণত পণ্য বা সেবার মূল্য কম হলে বৈদেশিক বিনিয়োগকারিরা বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। এই কারনে একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কম হলে অনেক সময় কতৃপক্ষ কারেন্সি বা মুদ্রার মূল্য কমিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রভাবিত করে থাকে। কিন্তু সব দেশেই যদি একই কারেন্সি বিদ্যমান থাকে তাহলে সরকারের পক্ষে কারেন্সির মূল্য কমানোর সুযোগ থাকে না। এতে করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যহত হয়। যেমন গ্রিসের কথাই বিবেচনা করা যাক। গ্রিসের অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠা একটু কঠিন হওয়ার কারন হলো সেখানে ইউরোর প্রচলন। অর্থাৎ তারা চাইলেই তাদের পলিসিগত কিছু পরিবর্তন (যেমন মুদ্রামান কমিয়ে) এনেই এত সহজে তাদের দেশে বিনিয়োগ প্রভাবিত করতে পারছে না। কারণ, কি পরিমান ইউরো মুদ্রিত হবে সেটার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই৷ শুধুমাত্র এই কারনেই অনেক দেশই একই মুদ্রানীতিতে যেতে রাজি নয়। 

পাশাপাশি বিশ্ব রাজনৈতিতে প্রত্যেক শক্তিশালী দেশই চাইবে নিজেদের মুদ্রার মান বাড়াতে। এতে করে তাদের হাতে বিশ্ববাজারের একটা বড় নিয়ন্ত্রণ থাকবে। সেক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট মুদ্রা ব্যবহার করলে সেই মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ একটা নির্দিষ্ট বা গুটিকয়েক দেশের হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা থাকে। এখন প্রশ্ন হলো মুদ্রামান   কিভাবে বৃদ্ধি পায়? সাধারণত যে দেশ সব চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় ও জরুরি পণ্য উৎপাদন করে সেই দেশের মুদ্রায় মুল্যমান তত বেশি হয়ে থাকে। সে কারনে প্রতিটা দেশই চাইবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন করতে। কিন্তু সব দেশে একই মুদ্রার প্রচলন হলে এই প্রতিযোগিতা কমে যাবে এবং ভোক্তারা সর্বোচ্চ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। 

শেষ একটা উদাহরণে আসি। সম্প্রতি সময়ে রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে রাশিয়ার মুদ্রার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ হলো বিশ্ব অর্থনীতি দারুন ভাবে রাশিয়ার উৎপাদিত পণ্যের উপরে নির্ভরশীল। যেহেতু তাদের উৎপাদিত পণ্যগুলোর উপর কম বেশি সবাই নির্ভরশীল সেহেতু তাদের মুদ্রার মান সবচেয়ে বেশি। এখন আমেরিকা ও রাশিয়া দুই দেশেই যদি একই মুদ্রা (যেমন ডলার) প্রচলিত থাকতো তাহলে রাশিয়া কোন ভাবেই রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে এত শক্ত অবস্থানে থাকতে পারতো না। কারণ ডলারের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে থাকাতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই আমেরিকার হাতে চলে যেত। একটি দেশ সেটা হোক রাশিয়া বা জাপান  কি কখনো তাদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নিজেদের অবস্থান হারাবে? 

বিশ্বব্যাপী একই মুদ্রা প্রচলনের বেশ কিছু উপকারিতা থাকলেও এই অপকারিতা গুলোই বেশি চোখে পাড়ে। বিশেষ করে শক্তিধর রাষ্ট্র গুলো কখনোই একটা মাত্র মুদ্রা ব্যবস্থায় গিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব হারাতে চাইবে না। আর এ কারনেই বিশ্বব্যাপী একই মুদ্রার প্রচলন সম্ভব নয়।

-আব্দুল্লাহ আল জাবির

Comments