মানুষ মাত্রই কৌতূহলী । কৌতূহলী মানুষ সবসময় অজানাকে জানা আর জানা বিষয়কে সবিস্তারে জানতে চায়। গবেষণা হলো সেই আদিম এবং অদম্য কৌতূহলের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সাধারণত গবেষণা বলতে বুঝায় সেই পদ্ধতিকে যেখানে জানা বা সংগ্রহকৃত তথ্যকে নিয়মতান্ত্রিক এবং যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। গবেষণা যেকোন সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য খুবই জরুরি। এল নিউম্যানের সোশ্যাল রিসার্চ মেথড বইয়ে বলা হয়েছে গবেষণাবিহীন সমাজ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে চলে। যেমনঃ
● অভারজেনারালাইজেশন এবং সিলেক্টিভ অবজারভেশন
● প্রিম্যাচিউর ক্লোজার
● হালো ইফেক্ট এবং ফলস্ কনসেনসাস
গবেষণা বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে যেমন- উদ্দেশ্য অনুসারে গবেষণা, গভীরতা এবং ক্ষেত্র অনুসারে গবেষণা, ব্যবহৃত উপাত্ত অনুসারে গবেষণা, অতিবাহিত সময় অনুসারে গবেষণা, তথ্যের উৎস অনুসারে গবেষণা, সংগ্রহের ধরন অনুসারে গবেষণা, ইত্যাদি ।
উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ, স্কলারশিপ পাওয়া অথবা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহনে আগ্রহী হলে গবেষণার কোন বিকল্প নেই। গবেষণায় অভিজ্ঞতা অর্জন শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময় থেকেই করা যায়। যেমন- গবেষণার তথ্য সংগ্রহ, জরিপ, সাক্ষাৎকার বা অনুবাদ করা। এমনকি বিভিন্ন সংস্থায় খন্ডকালীন গবেষণা সহকারী বা গবেষণা বিষয়ে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ দিয়ে থাকে। পত্রিকা বা পাবলিক প্ল্যাটফর্মে লেখালেখি করা, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ, পোস্টার উপস্থাপন মতো কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হওয়া যায়। এসব কার্যক্রম অবশ্যই অন্যদের থেকে অভিজ্ঞতা এবং কর্মক্ষমতা অর্জনে এগিয়ে রাখে। সদ্য স্নাতকোত্তর সম্পন্নকারীরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে রিসার্চ ইন্টার্নস, জুনিয়র রিসার্চ সহকারী বা গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগদান করা সম্ভব।
এবার আসা যাক, গবেষণা কিভাবে আমাদের ব্যক্তিগত সত্তাকে সম্মৃদ্ধ করতে পারে। গবেষণা নির্ভর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে প্রথম বিষয় হলো নিজেকে একজন ভালো গবেষক হিসেবে গড়ে তোলা। এছাড়াও সমাজে মানুষের সুষ্ঠুভাবে বসবাস করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট গুণাবলি অর্জন করতে হয়। তারমধ্যে-মানবতা, নিয়মানুবর্তিতা, সহনশীলতা, নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক মনোভাব অন্যতম। গবেষণা সম্পর্কিত কিছু গুণাবলি যা অন্য সব সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে তোলে-
● মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা
● পারস্পারিক যোগাযোগের দক্ষতা
● সমালোচনা গ্রহন করার মানসিকতা
এসব গুণাবলি একজন মানুষকে বিনয়ী হতে সাহায্য করে। বিনয়ী হওয়া মানুষের সাফল্যের জন্য যেমন দরকার, একজন ভালো গবেষক হিসেবে ততোধিক দরকার। জীবনের প্রতিটি ধাপেই আমাদের বিনয়ী হওয়া উচিত। মানুষের জীবনধারণ এর উপরও গবেষণা প্রভাব রাখে নিয়মতান্ত্রিক কাজের মাধ্যমে। ভালো পরিকল্পনা গবেষণা অগ্্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই পরিকল্পনা অবশ্যই নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে হতে হবে।
গবেষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার প্রথম ধাপ হলো পরিশ্রম এবং অধ্যাবসায়। পরিশ্রম এবং কঠোর অধ্যাবসায় এর সাথে অনুসন্ধান ও বিশ্লেষনী মনোভাব নিয়ে কাজ করা একজন ভালো গবেষক এর লক্ষণ। সূ²ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে যেকোনো বিষয় বা ঘটনাকে যুক্তি সহকারে বিশ্লেষণ করা যায়। যা মানুষের চিন্তাশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহনে ভূমিকা রাখতে সাহায্য করে।
অধিকাংশ মানুষের মধ্যে স্রোতে গা ভাসানো এবং কোন ব্যাপার বা ঘটনাকে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা থেকে, অনূভুতি বা বিশ্বাসের জায়গা থেকে দেখার একটা প্রবনতা থাকে। গবেষক হিসেবে ব্যক্তিকে অবশ্যই স্রোতের বিপরীতে চিন্তাধারা রাখতে হয় একজন যুক্তিবাদী বিশ্লেষক হিসেবে। অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণায় অর্থায়ন করার দক্ষতাও একজন গবেষকের মধ্যে থাকতে হয়। সাম্প্রতিক সময় এবং বিষয় সম্পর্কে সবসময় ধারণা থাকতে হয়। ভালো গবেষক হিসেবে নিত্য-নতুন প্রযুক্তির সাথে নিজেকে আপডেট করতে হয়।
গবেষণার সাথে মানুষের ধৈর্যশক্তি এবং জানার আগ্্রহ থাকা, দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা চলে। একজন গবেষকের টিমের সাথে বা একা, দুই ক্ষেত্রেই কাজ করার কৌশল জানতে হবে। হাল ছেড়ে দেওয়া এবং হতাশাগ্রস্থ হওয়া যাবে না কখনো, নিজের প্্রতি আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। নিজেকে জানতে হবে অন্যদের মানসিকতা বুঝার সাথে সাথে, যা একজন মানুষকে বাকি দশজন থেকে ভিন্ন করে তোলে।
সততা এবং নৈতিকতা গবেষকদের অত্যাবশকীয় একটি গুণ। কারণ গবেষক হিসেবে সম্মান ও উন্নতি অর্জনের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বড় ভূমিকা পালন করে। ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে সবসময় এবং যেকোনো সময়, যেকোনো পরিবেশ, পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অবশ্যই গবেষণা ও ব্যক্তিজীবনকে সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন উদ্যোমে কাজ করতে হবে।
সর্বোপরি, আমি গবেষক মানে নিজেই নিজের পথ প্রদর্শক। যাকে বলা যেতে পারে, স্ব-গতিতে, স্ব-আগ্রহে, স্ব - আনন্দে স্বশিক্ষা গ্রহণ করা। যেখানে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে নিজেকে ভেঙেচুড়ে নতুন মোড়কে গড়ে তোলার।
নাদিরা ইসলাম
সহযোগী সম্পাদক (দ্যা এনভায়রনমেন্ট রিভিউ)
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Comments
Post a Comment