আড্ডা, রান্না ও সিনিয়র অফিসার । Shahadath Hossain

Shahadath Hossain, Senior Officer, Rupali Bank Ltd.


চাকরির পড়ালেখার ব্যাপারে আমি একদম উদাসীন ছিলাম। মনে আছে অনার্স শেষ করেই বিসিএসের কোচিং-এ ভর্তি হয়েছিলাম, দুইমাসের মতো কোচিংও করেছিলাম, নোট ফোট করে এক্কেবারে একাকার অবস্থা। হঠাৎ একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব পেলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা আমাকে চিনেন তারা সবাই জানেন সংস্কৃতির 'স"টাও আমার জানা নেই, কিন্তু খুব ভালো সাংগঠনিক কাজ পারতাম বিধায় সংস্কৃতির মাঠে ভালোই দৌড়ঝাপ ছিলো আমার। টানা ১২ দিনের মতো রিহারসেলে সময় দিতে গিয়ে ওই যে আমি পড়া থেকে ছিটকে গেছি, অনেকে আমাকে অনেক মোটিভেশন দিয়েও পড়ার টেবিলে বসাতে পারে নি। 

মাস্টার্সের থিসিস ডিফেন্সের আগে স্টুডেন্টদের জান আসে যায় অবস্থা, অথচ ডিফেন্সের আগে আমি কৃষ্ণচূড়ার প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। হলে আমি  হিটারে (ইলেক্ট্রিক হীটার) রান্না করেই খেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যে হলে থাকতাম অই হলের সহকারী হল প্রভোস্ট ছিলেন আমার ইমিডিয়েট সিনিয়র এক ভাই। একদিন উনি হল ভিজিটে এসে আমার হীটারটা ভেঙ্গে ফেলছিলেন, যদিও আমার জানামতে, ছাত্র অবস্থায় উনিও হলে ভালোই হিটার ব্যবহার করতেন। ওইদিন উনার উপর খুব মেজাজ খারাপ হইছিলো, রাগে দুঃখে কি মনে করে যেনো পড়তে বসছিলাম, সপ্তাহ খানেক পড়ার পর আমি আমার আমার আগের রুটিং-এ ফিরে গেলাম। খালি আড্ডা আর রান্না করে খাওয়া ছাড়া কোন কাজই তখন করতাম না। কত চাকরির পরিক্ষা চলে যাচ্ছে হাতে গোনা দুই একটা ছাড়া এটেন্ড করা পরিক্ষার সংখ্যা নাই বললেই চলে।

হলের সহকারী হল প্রভোস্ট যখন আমার বন্ধু হলো তখন মাথায় বাজ পড়লো,   মাস্টার্স ডিগ্রি কমপ্লিট করার প্রায় ১১ মাস পর, আমার এখনো মনে আছে ১৭ আগস্ট ২০১৯  আমি পড়ার টেবিলে বসি। আমি এটা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, আমি যখন যে কাজে মন থাকি নামি , এই কাজ আমার থেকে ভালোভাবে কেউ করতে পারে না, আমার চেস্টার কোন ত্রুটি রাখি না অই কাজ করতে। 

ততক্ষণে প্রশ্ন এনালাইসিস করে বুঝলাম, আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি প্রশ্ন করার পসিবিলিটি ৯০%। তাই রিস্ক নিয়ে শুধু আহসান উল্লাহ বেইসড প্রিপারেশন নেয়া শুরু করলাম। আহসান উল্লাহ'র একটা জিনিস ছিলো তারা নিজেরা কোন প্রশ্ন না করে , কই থেকে কই থেকে কপি পেস্ট করে দিতো। আরো পরিস্কার করে বললে, বাংলা প্রশ্ন রিপিট করতো, ইংলিশ এক্সাম ভেদা আর ইন্ডিয়াভিক্স থেকে তুলে দিতে। ম্যাথ করতো আগারওয়ালের বই থেকে, কম্পিউটার আর সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন করতো এক্সাম ভেদা  থেকে। 
নো রিস্ক নো গেইন, হাতের সামনে আমার পাঁচটা ব্যাংক পরিক্ষা , এগুলাতেই একটা গতি করতে হবে। বুঝে না বুঝে ইন্ডিয়াভিক্স, এক্সামভেদা, আগারওয়ালের ম্যাথ বই মুখস্থ করা শুরু করলাম। যারা ব্যাংকে পরিক্ষা দেন,বা প্রিপারেশন নেন তারা জানেন প্রিলির রেজাল্টের পর রিটেনের প্রিপারেশন নেয়ার জন্য ব্যাংকের পরিক্ষাগুলোতে সময় পাওয়া যায় ম্যাক্সিমাম ১০-১২ দিন। তাই এক সাথে প্রিলি আর রিটেনের প্রিপারেশন নিতে হয়। 

১৭ আগস্ট থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে পড়া শুরু করতাম, সকাল বেলার পড়া শেষ হতো দুপুর সড়ে ১২টায়, মাঝখানে সকালের নাস্তার জন্য ৩০ মিনিটের বিরতি। আবার শুরু করতাম দুপুর তিনটা থেকে, চলতো আসরের আগ পর্যন্ত। তারপর সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত। দিনে প্রিলি আর রাতে রিটেনের প্রিপারেশন। 

এভাবে চলতে থাকলো বেশ কিছুদিন। আলহামদুলিল্লাহ আগারওয়ালের ম্যাথ অনেকেই ভয় পাইতো, আর আমার উত্তর সহ মুখস্থ ছিলো, যে অংকো বুঝতাম না, অইটা টানা মুখস্থ,কিচ্ছু করার ছিলো না আমার। আমার সাথের অনেকরেই দেখতাম ফোকাস রাইটে তেমন গুরুত্ব দিতো না, অথচ ফোকাস রাইটে আমার শীট ছিলো কম না হলেও ৫০০ পাতা। ইংলিশে আমি অনেক দুর্বল ছিলাম, যার কারণে আমাকে অনেক ভুগতে হইছিলো।

নো রিস্ক নো গেইন থিওরতিতে চলতে গিয়ে প্রথমেই খেলাম ধরা, হাতের পাঁচটা পরিক্ষার মধ্যে প্রথমটার দায়িত্ব পেল ঢাবির আর্টস ফ্যাকাল্টি, অবশ্য এটার রিটেন দিয়েছিলাম , ভাইভার জন্য কোয়ালিফাই করতে পারি নি। রূপালী সিনিয়র অফিসারের রিটেন মে বি ছিলো ডিসেম্বর ১৫,২০১৯ এ। এর আগের দিন রূপালী অফিসারের রিটেনের রেজাল্ট দিলো, ফেল করছিলাম। খুব মন খারাপ করে রাতের গাড়িতে সিনিয়র অফিসারের রিটেন দেয়ার জন্য উঠলাম। বেশ কিছু বাঁধা পেয়ে মিরপুর ১০-র পরিক্ষার হলে হাজির হলাম। 
আগেই বলেছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমার মাঝে একটা গুণ দিয়েছেন। যেটা আমি মন দিয়ে করি এটা সঠিক উপায়ে আমার থেকে ভালো করে কেউ করতে পারে না, এটা আমার বিশ্বাস। 

সাতটা অংক এসেছিলো পরিক্ষায়, বীজ গণিতের অংক ছাড়া বাকী ছয়টা ম্যাথই আগারওয়ালের বইয়ের নিয়মে , আল্লাহ ঐদিন আমারে অনেক সাহায্য করেছিলেন, এর মধ্যে দুইটা ম্যাথ আমার হুবুহ কমন, অই দুইটা ম্যাথ আমি কোন ক্যাল্কুলেশন না করেই আন্সার করেছি। পাশের জনের থেকে একটা ম্যাথ দেখে করেছি, অবশ্য উনারেও আমি একটা ম্যাথ দেখিয়েছিলাম। ইংরেজি ফোকাস রাইট পড়ে গিয়েছিলাম 'Role of Bank in Economic Development" আর পরিক্ষার এসেছিলো " Role of Bank in Employment Creation" এই টাইপের কিছু একটা, আমারে আর পায় কে, যা পইড়া গেছিলাম একটু মোডিফাই করে হুবুহ তোলে দিলাম খাতায়। আল্লাহর কি রহমত বাংলা থেকে ইংলিশ ট্রান্সলেশনটাও ঐদিন আমার কমন পড়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ ভাইভার জন্য ডাক পেয়েছিলাম। ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গিয়ে ভাইবা দিয়ে আসলাম। 
তারপর থেকে শুরু হলো আসল খেলা টেনশন আর টেনশন। কত যে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করছি এই চাকরিটার জন্য। আমার আম্মা-আব্বার প্রতিটা তাহাজ্জদের পর দোয়ার বড় অংশ ছিলো আমার এই চাকরির জন্য দোয়া। দোয়া কবুলের যতগুলা আমল খোজে পেয়েছি, প্রায় সবগুলাইতেই ছিলো আমার এই চাকরির জন্য দোয়া। 

৩০ জুন,২০২০, আল্লাহর কাছে চাইলাম, আল্লাহ আমারে হতাশ করেন নাই, আমার আব্বা আম্মার দোয়া আল্লাহ ফিরাইয়া দিতে পারেন নাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের একটা পিডিএফ ফাইলে নিজের রোল নাম্বার খোজে পাওয়ার কত যে আনন্দ, কত যে সুখ এটা বলে বুঝানো সম্ভব না। 

আমার পার করা কঠিন সময়গুলোতে আমার পরিবারের বাইরে আমার আরেকটি পরিবারের সহযোগিতা কখনোই ভুলবার নয়। জামাল স্যার, এই লোকের ঋণ কিভাবে আমি শোধ করবো,আদো শোধ করার যোগ্যতা হবে কিনা আমি জানি না। জামাল স্যার আমারে যে কিভাবে সহযোগিতা করছেন, এইটা পুরাই বানানো গল্প মনে হবে অনেকের কাছে। কাছের তিনটা জুনিয়র দীপ্ত,রনি আর বাউল রুবেল এদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই। অহো আরেকজন আছে, খলিল,যার জন্য করে মন থেকে করে বন্ধু আমার। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা এই মানুষগুলার প্রতি। এই মানুষগুলা পাশে থাকলে  পাহাড়ি পথও সমতল মনে হবে। 

৩০ জুন, ২০২০'র আনন্দ আমার জীবনে বিভিন্ন রূপ বদলে বার বার ফিরে আসুক, এই দোয়া করবেন সবাই।
-Shahadath Hossain, Senior Officer, Rupali Bank Ltd.

Comments