"আন্ডারগ্রেডে রিসার্চ" শব্দ দুটোর সাথে আমাদের অনেকেরই মনে জড়িয়ে আছে কিছু টা কৌতূহল আর খানিকটা ধোঁয়াশা। গবেষণা শব্দটাই এমন যেটা শুনে কেউ হয়তো ভেবে নেন, এই জগৎ সবার জন্য না। অনেকে আবার ভাবেন গবেষণা করে কি হবে! আমি তো বিদেশে পড়তে যাবোনা! এই ভাবনা খানিকটা সত্য হলেও খানিকটা অসত্যও থেকে যায়। তাহলে কি স্নাতক পর্যায়ে সবার জন্যই গবেষণা? সে হিসাবে না গিয়ে আমরা আজকে একটু হিসাব নিকাশ করে দেখবো বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবার জন্য গবেষণায় যুক্ত হওয়া কতটা যুক্তি সম্মত!!
তার আগে আমরা একটু গবেষণা শব্দটার অর্থ জেনে নেই। গবেষণা হচ্ছে একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ (Systematic) অনুসন্ধান প্রক্রিয়া যেখানে আমরা তথ্য উপাত্ত ব্যাবহার করে এবং কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে একটা উপসংহারে উপনীত হই।
তাহলে এই সংজ্ঞা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, গবেষণায় যুক্ত হলে বা আপনি গবেষণা শিখলে অন্তত চারটি বিষয় শিখতে পারবেন। এই চারটি বিষয় কি কি?
১।
শৃঙ্খলাবদ্ধ/অর্গানাইজড হওয়া
২।
অনুসন্ধান প্রক্রিয়া জানা
৩।
কিভাবে তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করতে হয় সেটা জানা, এবং
৪। উপসংহারে উপনীত হতে শেখা।
এবার
প্রথম দিকের কথাতেই ফিরে যাই। আমাদের দেশে
গবেষণা বলতে কয়েকটা বিষয় মাথায় আসে। তার মধ্যে
অন্যতম হলো,
এটা
শুধুমাত্র যারা দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য যাবে তাদের জন্য,
অথবা,
বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা গবেষকদের জন্য,
অথবা, এইটা শুধুমাত্র স্নাতত্তোর পর্যায়ের ডিগ্রি লাভের জন্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে শেখা, অনুসন্ধান প্রক্রিয়া জানা, তথ্য উপাত্ত ব্যবহার বা একটা উপসংহারে উপনীত হতে শেখাটা কি শুধু মাত্র উচ্চ শিক্ষা বা গবেষকদের প্রয়োজন? ব্যক্তি জীবনে আমি আপনি কি এসবের উর্ধ্বে?
আসলে
অনেক বছর ধরে আমাদের কাছে গবেষণা বিষয়টা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে এটাকে আমরা
একটা অতি ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছি। এর অনেক গুলো কারনের অন্যতম একটা কারন হচ্ছে ব্যক্তি
জীবনে আমরা গবেষণার কোন সংশ্লিষ্টতা বা কো-রিলেশন পাই না। আর এই কারনেই আমরা সম্ভবত
গবেষণা বা গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ঠতাকে নিজের করে ভেবে দেখতে পারি না।
সেদিকে আর না যাই।
এই আর্টিকেলের মূল উদ্দেশ্য ছিলো আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে গবেষণা কতটা প্রয়োজনীয়। বিশেষত যারা সরকারি চাকরির বিষয়ে খুবই প্যাশনেট বা উত্সাহী।
বর্তমান প্রেক্ষাপট যদি চিন্তা করি তাহলে আমরা সবাই জানি যে একটা ৯/১০ গ্রেডের চাকরি পাওয়া কতটা কষ্টকর আমাদের জন্য। এর কারন হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাওয়ার জন্য আমাদের কয়েকটা ধাপ পার হওয়া লাগে। প্রথমত প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, এর পরে লিখিত, এবং তার পরে ভাইবার মুখোমুখি। এই প্রতিটা পর্যায়ে আপনি যদি অসাধারন না হতে পারেন তাহলে চাকরি পাওয়া অনেকটা কঠিন।
কিন্তু, এর সাথে গবেষণার সংশ্লিষ্ঠতা কোথায়?
স্নাতক পর্যায়ে একজন গবেষক হিসাবে আপনাকে প্রথমেই একাডেমিকের বাইরের পড়াশোনায় অভ্যস্ত হতে হবে। আসলে অনেকটা বাধ্য হয়েই। আপনি গবেষণাপত্রের ইন্ট্রোডাকশন ও লেটারেচার রিভিউ লিখতে গেলে আপনাকে আমাকে ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ের উপরে অসংখ্য গবেষণাপত্র পড়তে হবে এবং লিখতে হবে। একটা ইন্ট্রোডাকশন লিখে শেষ করতে পারা অনেকটা আকাশ জয়ের সমান। অন্তত যারা গবেষণায় নতুন তাদের জন্য বেশ কঠিন। কিন্তু একবার শিখে নিতে পারলে আপনি ধরে নিতে পারেন, যে কোন লেখা লিখির ক্ষেত্রে আপনি অসাধারন একটা দক্ষতা অর্জন করে নিলেন।
আর
এই বিষয়টা আপনাকে চাকরির পরীক্ষায় লিখিত অংশে প্রচন্ড রকম সহায়তা করবে (এটা কিন্তু
মোটেও মোটিভেশনাল কথা না। আমাদের ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতা থেকেই বলা)।
আগেই
বলেছি যে গবেষণাপত্রের ইন্ট্রোডাকশন লেখা বেশ কঠিন। কিন্তু কেন?
গবেষণায় ইন্ট্রোডাকশন লেখা একটা সিস্টেমেটিক ওয়ে অনুসরণ করে। সেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু ধাপ অনুসরন করতে হয়। এই ধাপগুলো অনুসরন করে আপনি ইন্টোডাকশন লেখা শিখে নিলে আপনাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না।
তাছাড়া
আপনি সোস্যাল সাইন্সের যে কোন বিষয়ের ছাত্র হলে তো কথাই নেই।
কারন আপনি যে সকল বিষয় নিয়ে গবেষণা করবেন বা পড়াশোনা করবেন, চাকরির পরীক্ষায়
লিখিত অংশে মোটামুটি তার ধারে কাছের বিষয়েই “ফোকাস রাইটিং” লিখতে হয়।
যেমন
ধরেন এই সিজনে আপনি যদি “কোভিড-১৯” এর উপরে একটা “রিভিউ আর্টিকেল” বা “ সার্ভে”
টাইপ গবেষণা করতেন তাহলে লিখিত পরীক্ষায় অন্তত পক্ষে এই সংক্রান্ত বিষয়ে ঝামেলায়
পড়তে হবে না।
এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, যারা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করে যায় তাদের বেশিরভাগেই আপনাকে বলবে, লেখায় তথ্য উপাত্ত ব্যবহার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে উপস্থাপনার কৌশল। অর্থাৎ আপনি কত সুন্দর করে বিষয়টা উপস্থাপন করলেন সেটা এখানে মুখ্য।
সে ক্ষেত্রে একজন গবেষকের কাছে (যিনি অন্তত কিছুটা পারেন) এটা খুব কঠিন কোন বিষয় না।
তাছাড়া গবেষণায় সম্পৃক্ততা আপনাকে নতুন নতুন অনেক বিষয়ে ধারণা দিবে এবং সেটা কিভাবে কখন প্রয়োজন হবে আপনি ধারণাও করতে পারবেন না।
পাশাপাশি, গবেষণায় সম্পৃক্ততা দায়িত্বশীলতা আর পেশাদারিত্ব বাড়িয়ে দেয়। আপনার ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করতে সহায়তা করে, কোনো কিছু কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টে দেয়। গবেষণায় জড়িত হওয়ার কারনে আপনার মধ্যে সহজাতভাবেই বাঁধা অতিক্রম করার মানসিকতা তৈরী হয়।
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে একটি গবেষণা কয়েকজনে মিলে করা হয় সেহেতু গবেষণায় সম্পৃক্ততা, একা ও দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা বৃদ্ধি করে, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। পাশাপাশি, কোনো বিবৃতি কে যুক্তি, তর্ক ও উপাত্ত দিয়ে উপস্থাপনের দক্ষতা তৈরী হয়। কোনো বিষয়ের বেসিক কনসেপ্ট এর পাশাপাশি লিটারেচার রিভিউ, তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞানের মেলবন্ধনে সহায়তা করে। ডাটা এনালাইসিস করে ফলাফল উপস্থাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি ঘটানরা সাথে অন্য ঘটনার সংযুক্ততা বের করে সম্ভাব্য যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়। যেটা আপনাকে আরো বেশি চিন্তাশীল হিসাবে তৈরি করবে।
গবেষণা প্রক্রিয়া বিজ্ঞানসম্মত ধাপ গুলোর অনুসরণ করে, যা স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীকে স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারে বিভিন্ন ল্যাব টেকনিক সম্পর্কে। এটি critical thinking করতে শেখায়। পাশাপাশি বিভিন্ন কম্পিউটার প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানা, টাইম ম্যানেজমেন্ট ও প্রফেশনাল কমিউনিকেশন কে সহজ করে তোলে। গবেষণা জড়িত হওয়ার কারনে আপনার ইংরেজি ভাষায় (oral এবং written) দক্ষতা বৃদ্ধি পায় প্রচন্ড রকম যা পরবর্তীতে চাকরী পরীক্ষায় focus writing বা translation কে সহজ করে তোলে। গবেষনাপত্র আপনার resume তে নতুন মাত্রা যোগ করে।
আমরা
হয়তো জানি বেশ কিছু বিষয়ে পড়াশোনা করতে গেলে স্নাতক ডিগ্রি পাওয়ার জন্য রিসার্চ প্রজেক্টে
যুক্ত হতে হয়। তবে সবার ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতা থাকেনা।
আপনার উদ্দেশ্য যা-ই হোক, নিঃসন্দেহে বলা যায় স্নাতক পর্যায়ে গবেষণা আপনার আত্ম উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
মোটা দাগে বলা যায়, গবেষণা সম্পৃক্ততা আপনার analytical ability, interpersonal skill কে বৃদ্ধির সাথে সাথে একজন মানুষ হিসেবে উন্নতিরও সুযোগ দেয় যা আপনাকে অন্যদের চাইতে এক ধাপ এগিয়ে রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আন্ডারগ্রেডের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণায় অভিজ্ঞতা থাকলে, পিএইচডি করার প্রত্যাশা ২৯% বৃদ্ধি পায়। আর আমাদের দেশের বেশীরভাগ সরকারি চাকরীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ৫-৮ বছর ছুটি (বেতন সহ) দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আপনি স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরেও যাবেন আবার দেশের বেতনও পাবেন। এই সুযোগ নিশ্চয় হাতছাড়া করতে চাইবেন না। স্নাতক পর্যায়ে গবেষণা থাকলে পিএইচডি করার সাহস আপনিই এমনিতেই পাবেন।
সুতরাং, স্নাতক পর্যায়ে গবেষণার কাজে জড়িত হওয়া ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি যেমন আপনাকে পার্সোনাল ডেভেলপমেন্টের সুযোগ দেয়, তেমনি ভবিষ্যতে মানুষের জন্য কিছু করার পথ তৈরী করে। সেই সাথে নতুন সুযোগের রাস্তা তৈরি করে রাখতে সহায়ক হবে।
গবেষণায় সংযুক্ত হলেই যে আপনি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একটা সরকারি চাকরী পেয়ে যাবেন সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আবার পাবেনও না সেটাও কিন্তু নয়। তবে এতটুকু বলা যায় যে, আমি নিজের পরিবর্তন নিজেই দেখতে পারবেন।
Comments
Post a Comment