গবেষণাপত্রের প্রতিটা অংশই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, নতুনদের জন্য রেজাল্টস সেকশন লেখাটা সাধারণত কিছুটা কঠিন হয়ে যায়। এর বেশকিছু কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রেজাল্টস-এ অনেক গুলো বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন হয়। সেই সাথে প্রয়োজন হয় রেজাল্টের বর্ণনা দেয়া।
এই প্রতিটা বিষয়েই আসলে কিছু না কিছু ঝামেলা হয়, বিশেষ করে যারা গবেষণায় নতুন। মজার বিষয় হচ্ছে এই সেকশনেই থাকবে আপনার গবেষণাপত্রের একদম কোর ফাইন্ডিংস যেটা আপনি পাবেন মেথডে উল্লেখিত স্টাটিস্টিক্যাল টেকনিকগুলো ব্যবহার করে।
এবং এখানে ফাইন্ডিংস গুলো মোটামুটি সিকোয়েন্স মেইনটেইন করে এবং অথরের(লেখক/রচয়িতা) কোন মতামত ছাড়াই লেখা হয়। আর হ্যাঁ, রেজাল্ট সেকশন এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গবেষনালব্দ ফলাফলকে বর্ণনা করা যাতে করে বোঝা যায় কেন প্রাপ্ত ফলাফল গবেষণার ঐ নির্দিষ্ট এরিয়াতে কেন গুরুত্বপূর্ণ।
তো চলুন জেনে নেয়া যাক কিভাবে গবেষণাপত্রে গবেষনালব্ধ ফলাফল/রেজাল্টস উপস্থাপন করা হয়?
একটা গবেষণাপত্রে রেজাল্টস সাধারণত নিচের দুইভাবে উপস্থাপন করা হয়।
১। রেজাল্টের টেবুলার প্রেজেন্টেশন
২। রেজাল্টের গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন
টেবুলার প্রেজেন্টেশন
সাধারনভাবে ডাটা এনালাইসিস করার পর যে সংখ্যাগত আউটকামগুলো আসে সেটাই টেবিলের মাধ্যমে প্রেজেন্ট করা হয়। টেবিলের মাধ্যমে প্রেজেন্ট করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে রেজাল্টগুলোর সঠিক সংখ্যাটা সরাসরি দেখায় যেটা গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশনে পুরোপুরি সম্ভব হয়না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মডেল থেকে প্রাপ্ত রেজাল্ট গুলোই টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
যেমন, লিনিয়ার রিগ্রেশন/বাইনারি লজিস্টিক রিগ্রেশন এনালাইসিস থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আপনি গ্রাফিক্যালি প্রেজেন্ট করতে পারবেন না। আর পারলেও সেটার বর্ণনা দেয়াটা কঠিন হয়ে যাবে।
আবার দেখা যায় বিভিন্ন এনালাইসিস থেকে প্রাপ্ত ফলাফল ব্যাখ্যা করতে একই সাথে বেশি কিছু প্যারামিটার বা স্টাটিস্টিক প্রয়োজন হয়, যেটা গ্রাফিক্যাল বা ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায় না। এরকম ক্ষেত্রেই বেশিরভাগ সময় টেবুলার প্রেজেন্টেশন ব্যবহার হয়।
গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন
কোনো একটা সিচুয়েশনকে খুব ভালোভাবে প্রেজেন্ট করার জন্যই গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টশন দরকার হয়। যেমন, একটি নির্দিষ্ট এলাকাতে কত শতাংশ মানুষ প্রাইমারী, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে সেটাকে টেবুলার ফর্মে প্রেজেন্টের পাশাপাশি ভিজুয়ালি প্রেজেন্ট করা যায়। শুধুমাত্র দেখেই যাতে একটা আইডিয়া করা যায় এমন পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশন সবচেয়ে ভালো। তবে খুব ভালো ভালো গবেষণাপত্রে খুবই এডভান্স গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন করা হয়।
যেমন ধরুন কোন একটা এলাকার বা দেশের বিভিন্ন জায়গার তাপমাত্রাকে আপনি গ্রাফিক্যাল/ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে খুব সহজে ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।
তাছাড়া অনেক বেশি ডেটা নিয়ে গবেষণায় গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন বেশিই ব্যবহার হয়। বিভিন্ন জায়গার কোন একটা ভ্যারিয়েবলের তুলনামূলক উপস্থাপনে ভিজিয়াল বা গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশনের বিকল্প নেই। ভিজুয়াল বা গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন যেমন ফলাফল উপস্থাপনকে বেশি বোধগম্য করে তোলে, একই সাথে গবেষণাপত্রের ফলাফলের গ্রহনযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়।
রেজাল্ট বর্ণনা
রেজাল্ট বর্ণনা করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে তিনটা ধাপ অনুসরণ করা যায় বা হয়।
প্রথমত, টেবিল বা গ্রাফে দেয়া তথ্যটাকে বর্ণনা করা হয়।
দ্বিতীয়ত, ঐ রেজাল্টের আর্গুমেন্ট বা জাস্টিফিকেশন করা হয়/যায়। অর্থাৎ, আপনার গবেষণায় কেন একটি নির্দিষ্ট ধরণের রেজাল্ট পেলেন সেটার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন হতে পারে একটা ভ্যারিয়েবলের সাথে অন্য ভ্যারিয়েবলের কো-রিলেশন পেলেন, যেটা পাওয়ার কথা ছিলো না। কেন এই কো-রিলেশন পাওয়া গেল সেটাকেও ব্যাখ্যা করা হয়। এবং সবশেষে, আপনার রেজাল্টের সাথে অন্য কোন রিসার্সার একই রকম বা বিপরীত কোন রেজাল্ট পেয়েছেন কিনা সেটা উল্লেখ করা হয়। তবে যদি বিপরীত রেজাল্ট পেয়ে থাকেন তাহলে কেন আপনার তাদের মত রেজাল্ট আসেনি সেটার ব্যাখ্যা দেয়া যায়।
সাধারণত রেজাল্ট সেকশনে নিচের অংশগুলো থাকে
- রেজাল্টের প্রথমেই খুব ছোট করে একটা ইন্ট্রোডাকশন থাকে যেখানে রিসার্স কোশ্চেনটা আরো একবার উল্লেখ করা হয়/যায়। এতে আপনার গবেষণাপত্র যিনি পড়বেন তার জন্য রিসার্স কোশ্চেনটা পুনরায় মনে করতে সহজ হবে।
- সোস্যাল সাইন্সের গবেষণায় ইন্ট্রোডাকটরি সেকশনের পরে Sociodemographic বর্ণনা করা হয়। সাধারণভাবে আপনার গবেষণায় যে পপুলেশন বা কমিউনিটি নিয়ে কাজ করলেন তারা কোন ধরণের অর্থনৈতিক অবস্থা বা সামাজিক অবস্থায় আছেন সেটা সম্পর্কে ধারণা দিতে এই অংশটি রাখা হয়।
- এর পরে ধারাবাহিকভাবে রেজাল্ট বর্ণনা করা হয়। মেথডস ও ম্যাটারিয়াল অংশের যে অবজেকটিভের বর্ণনা বা এনালিটিক্যাল টেকনিক আগে বর্ণনা করা হয়েছে, রেজাল্টেও সেই অংশটা আগে বর্ণনা করতে হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রেজাল্ট বা ফলাফল গুলোই বর্ণনা করা হয়।
- গুরুত্বপূর্ণ রেজাল্ট বর্ণনা করা হয়ে গেলে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ রেজাল্ট গুলো বর্ণনা করতে হবে এর পরের অংশে। তবে এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ রেজাল্ট গুলোর প্রতিটি রেজাল্ট বা আউটকামকে আলাদা ভাবে বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। বরং সামারি আকারে বর্ণনা করা ভালো।
- রেজাল্ট সেকশনে টেবিল বা ফিগারগুলোর সিরিয়াল নাম্বার অনুযায়ী দিতে হবে এবং বর্ণনাও একই ক্রমে হবে। বিশেষ প্রয়োজন না হলে একই রেজাল্ট টেবিল ও গ্রাফ উভয় ভাবে না দেয়াটা ভালো। ফিগারের ক্ষেত্রে legend (যেমন, কোন গ্রাফে X-axis বা Y-axis থাকলে কোনটা দিয়ে কি বোঝাচ্ছে সেটা উল্লেখ করা) এ ক্লিয়ার ইনফরমেশন থাকতে হবে। অর্থাৎ, ফিগারের কোন অংশ, রং, ইত্যাদি কি অর্থ বোঝাচ্ছে সেটা পরিষ্কারভাবে উপস্থাপণ করতে হবে। এতে গবেষণাপত্রের রিডাবিলিটি বা পঠনযোগ্যতা বাড়বে।
কিছু সাধারণ ভুল
- রেজাল্ট সেকশনে প্রতিটা “র” ডেটা না দিয়ে রেজাল্ট সামারি দেয়টা বেশি ভালো। তবে যদি একান্তই গবেষণাপত্রে র-ডেটা উল্লেখ করার প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে supplementary materials হিসাবে গবেষণাপত্রের শেষে উল্লেখ করা যেতে পারে।
- যদি রেজাল্ট উপস্থাপনার জন্য গবেষণাপত্রে টেবিল বা ফিগার ব্যবহার করা হয় সেক্ষেত্রে প্রতিটা রেজাল্ট বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ রেজাল্টগুলো বর্ণনা করলেই হয়। যিনি গবেষণাপত্রটি পড়বেন তিনি কম গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে জানতে আগ্রহী হলে টেবিল বা গ্রাফ থেকে দেখে নিবেন বলে ধরে নেয়া হয়।
- অনেক সময় অনেকে রেজাল্ট সেকশনে নতুন করে ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন বা মেথডস সম্পর্কিত কথা নিয়ে আসেন, যেটা রেজাল্ট সেকশনকে অপ্রয়োজনীয় ভাবে দীর্ঘায়িত করে। এরকম অবস্থায় কারো যদি মনে হয় আরো ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন প্রয়োজন, তাহলে সেটা ইন্ট্রোডাকশনে উল্লেখ করা ভালো।
- কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় মেথডস এর সাথে রেজাল্ট ঠিকঠাক মিলে না। বা যিনি আপনার গবেষণাপত্র পড়বেন, তিনি দুটোকে সংযুক্ত করতে বা ইন্টাররিলেট করতে পারেন না। এরকম ক্ষেত্রে মেথডসে ব্যবহৃত টেকনিকগুলো খুব বিস্তারিত ভাবে উপস্থাপণ করা উচিৎ। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় মেথডসে ব্যবহারিত টেকনিক খুবই বিস্তারিত ভাবে উপস্থাপন না করলে জার্নাল গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেন না (রিজেক্ট করেন)।
- নতুন যারা গবেষণা করেন তারা মাঝে মাঝেই নেগেটিভ রেজাল্ট গুলোকে রেজাল্টের বর্ণনায় উল্লেখ করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। যেটা রিসার্স ইথিক্স এর বাইরে চলে যায়। এরকম পরিস্থিতিতে কোন গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল আপনার রিসার্স হাইপোথিসিসের বাইরে গেলেও সেটা উল্লেখ করাটাই ভালো। এতে ভবিষ্যৎ রিসার্স ক্ষেত্র তৈরি হয়।
- প্রায়ই অনেক গবেষক রেজাল্ট উপস্থাপন করতে খুব বেশি সংখ্যক টেবিল বা ফিগার ব্যবহার করেন যেটা অনেকে পাঠকের জন্য নিজ থেকে বুঝে নেয়া কঠিন হয়। আবার অনেকে খুব জটিল ফিগার বা টেবিল ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে গবেষক হিসেবে উচিৎ হবে রেজাল্ট খুব সহজ ভাবে টেবিলে বা ফিগারে উপস্থাপন করা। জটিল কোন ফিগার বা টেবিল একান্তই প্রয়োজন হলে Supplementary materials হিসাবে গবেষণাপত্রের শেষে উল্লেখ করা যেতে পারে।
শেষ কথা,
গবেষণাপত্রে রেজাল্ট সেকশন কিভাবে লিখতে হয় সেটা শুধুমাত্র আর্টিকেল পড়ে বোঝা কিছুটা কঠিন। সেক্ষেত্রে কোন মেন্টরের সাহায্য পেলে শিখে নেয়াটা বেশ সহজ হয়। তবে নতুন হিসাবে রেজাল্ট সেকশন লেখা শুরু করার আগে কিভাবে রেজাল্ট সেকশন লিখতে হয় সে সম্পর্কে এই আর্টিকেল আপনাকে বেশ কিছু ধারণা দিবে।
এই আর্টিকেলের ২য় অংশে আমরা একটা গবেষণাপত্র নিয়ে আলোচনা করবো যে ঐ গবেষণাপত্রে রেজাল্ট সেকশন কিভাবে লেখা হলো।
আর একটা বিষয়, রেজাল্ট সেকশন লেখার ক্ষেত্রে Tense এর দিকে লক্ষ রাখা খুব জরুরি। কারণ, বর্ণনার ধরণ অনুযায়ী লেখায় Tense এর পরিবর্তন ঘটে। সেক্ষেত্রে আপনি এই লিংকে গিয়ে গবেষণায় ব্যবহারিত Tense সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা নিতে পারেন।
Comments
Post a Comment