একবিংশ শতাব্দীতে এসেও প্রকৃতির কাছে মানব সভ্যতার এই অসহায় আত্মসমর্পণ দেখতে হবে, কেউ বোধহয় ভাবেনি আগে। খালি চোখে যাকে দেখা যায় না, তেমনই এক শত্রুর আক্রমনে স্থবির হতে হলো বিশ্বকে।
কোভিড ১৯, যা চীনের উহান প্রদেশে ২০১৯ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সব-কটি দেশে। ফলে, পুরো বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী এ মহামারী আমাদের খাদ্য সরবরাহে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। করোনা ভাইরাসের দরুন বিশ্বব্যাপী লকডাউন থাকায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং লাখ লাখ মানুষ এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, তাদের নেই কোন কাজের ব্যবস্থা, নেই খাবারের যোগান। এবং সেই একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ২০২১ সালেও। ফলে অনেক পরিবার তাদের তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ আরও তিন আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে- চলমান করোনাভাইরাস সংকট সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে। এবং এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, আমরা কোন ভাবেই বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঘাটতির প্রভাব থেকে শতভাগ মুক্ত নই।
এই করোনাভাইরাস দরুন বিভিন্ন দেশের সরকার লকডাউন ব্যবস্থা জারি করেছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও খাদ্য সরবরাহ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। ভ্রমন নিষেধাজ্ঞা এবং কিছু দেশের সীমান্ত বন্ধ হওয়ার কারণে খাদ্য বোঝাই কন্টেইনার গন্তব্যস্থলে বিলম্বে পৌঁছাচ্ছে ২০২১ সালেও। ফলে ধারনা করা হচ্ছে, পচনশীল খাবার গুলো খাদ্য বর্জ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে তৈরি করবে খাদ্য সংকট।
তাই, শুধু বিশ্বব্যাপিই নয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেও খাদ্য সরবরাহ এখন বিশেষজ্ঞদের প্রধান চিন্তার বিষয়। বিশ্বের একটি বড় অংশে যাতায়াত ও পন্য পরিবহন সীমিত হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষের কাছে খাদ্য কিভাবে পৌছাবে তা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। ২০২০ সালের প্রভাব কিছুটা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০২১ সালে আমাদের আবারো মুখোমুখি হতে হচ্ছে আরো বড় চ্যালেঞ্জের। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। এবং একই সাথে যুক্ত হচ্ছে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। এই পরিস্থিতিতে সুদিন ফিরিয়ে আনা কোনো সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সকল স্তরের সহযোগিতা।
ধারনা করা হচ্ছে, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় ও কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ধাপের কারনে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। ফলে খাদ্য মজুদ যতই থাকুক না কেন গরীব মানুষরা যদি পর্যাপ্ত খাদ্য না পায় তাহলে এই খাদ্য মজুদের উদ্দেশ্য বিফল। কেননা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৮০ শতাংশ মানুষ বাজার থেকে খাদ্য কিনে খায়। তার মানে দরিদ্র মানুষগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাজারে স্বল্প মূল্যের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। যার জন্য খাদ্য দ্রব্য বিপণনের প্রতিটা ধাপেই প্রয়োজন কঠোর তদারকি।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কৃষির উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো'র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৩ কোটি ৩০ লাখ দরিদ্র এবং এর ভেতরে ১ কোটি ৭০ লাখ অতিদরিদ্র। এদেশের অধিকাংশ কৃষক যান্ত্রিক কৃষিতে খাপ খাওয়াতে না পারায় শ্রমঘাটতির মুখোমুখি হয়ে পড়ছে সমগ্র কৃষি ব্যবস্থাপনা। তাই ফসল কাটার ক্ষেত্রে উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে কৃষকরা। তাছাড়া, ক্রেতার ঘাটতি ও পণ্য সরবরাহের প্রতিটা ধাপে সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষক কম দামে পণ্য বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। আর এ ঘাটতি কমাতে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার জোর দিয়েছে কৃষির উপর। এই উদ্দেশ্য সফল করতে হলে, কোন ভাবেই কৃষি পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত করা যাবে না। তাই কৃষকের মাঝে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।
খাদ্যের পর্যাপ্ততা বাড়ানোর জন্য বহুমুখী ও সহনশীল কৃষিব্যবস্থা প্রসার করা দরকার। আর এই লক্ষ্যে, সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলোর করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করা জরুরী।
অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে গ্রামীণ পর্যায়ে ২০২০ সালের মতই ২০২১ সালে কৃষি পন্য কেনার মধ্য দিয়ে কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেননা বেশি খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে কিন্তু, শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদন হলেই হবেনা। খাদ্য মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা এবং ক্রেতার সেই পন্য কেনার শারীরিক ও অর্থনেতিক সামর্থ্য আছে কিনা তাও নিশ্চিত করতে হবে।
কোভিডের কারণে অনেক এলাকায় উৎপাদন, বিতরণ ও বাজারজাতকরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ করতে প্রয়োজন হচ্ছে কয়েক দিন থেকে কইয়েক সপ্তাহ। যেটা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। তাছাড়া দুগ্ধ খামার, পল্টি ফার্ম এবং মৎস চাষে ব্যবহৃত খাদ্য সরবরাহ করতেও ব্যবসায়ীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে ।
এই প্রতিটা ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধান না পাওয়া গেলে ফসল উৎপাদনে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে ধারণা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফসল তোলা শুরু হবে বা এখনি বোরো মৌসুমের ফসল তোলা শুরু হয়েছে। তাই পণ্যগুলোর অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে সরকারকে এক্ষনি সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। সেজন্য এফএও, ডব্লিউএইচও এবং ডব্লিউটিও এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ ও বিতরণে নিযুক্ত কর্মীদের রক্ষার পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। তাছাড়া কোভিড আক্রান্ত পরিবারকে স্বল্প সময়ের জন্য খাদ্য সহায়তা দিতে হবে বলে তাদের পরামর্শ। সরকারিভাবে পুষ্টিকর খাবার স্বল্প মূল্যে বিতরণ করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা ও ঋণসহায়তা প্রদান করতে হবে। যেন তারা পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করতে পারে। খাদ্যের পর্যাপ্ততা বাড়ানোর জন্য বহুমুখী ও সহনশীল কৃষিব্যবস্থা প্রসার করা দরকার। আর এই লক্ষ্যে, সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলোর করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করা জরুরী।
Comments
Post a Comment